দেশ কে এগিয়ে নিতে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী ভোট দিতে হবে

সিলেট বিভাগীয় কমিশনার খান মোহাম্মদরেজা-উন-নবী বলেছেন, “ আসন্ন  নির্বাচনে আমাদের এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে যারা দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ কে এক সাথে নিয়ে চলতে পারেন এবং সবাইকে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবেন। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।” আমরা দীর্ঘদিন স্বাধীন ভাবে মতপ্রকাশ করতে পারি নাই। এবার একটি সুযোগ এসেছে এটা কাজে লাগাতে হবে। যোগ্য প্রার্থী কে নির্বাচিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “ফ্যাসিবাদ কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ইসলামে সংঘাতের কোনো স্থান নেই। নিরপরাধ মানুষকে আঘাত কিংবা হত্যা করার কোনো বিধান নেই। মানবাধিকার সংকুচিত করার অধিকার কারও নেই। সবাই স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার রাখে।”

তিনি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবিকতা ধ্বংস হলে শান্তি ও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। এজন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

বুধবার সকালে শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের এমআইপিএস প্রকল্পের উদ্যোগে “আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও নির্বাচন: বাস্তবতা ও করণীয়” শীর্ষক সিলেট আঞ্চলিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

সুনামগঞ্জ পিস অ্যাম্বাসেডর নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী নুরুল হক আফিন্দীর সভাপতিত্বে এবং সিলেট পিস অ্যাম্বাসেডর নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী জালাল উদ্দিন রুমী ও এমআইপিএস প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর আকলিমা চৌধুরীর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সরূপ বড়ুয়া, সিনিয়র রেভারেন্ড ফিলিপ বিশ্বাস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (অবসরপ্রাপ্ত) মনোজ বিকাশ দেবরায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান, সিলেট জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তারিক। “ধর্ম, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্র: শান্তির জন্য পরস্পর সংযুক্ত” শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. শাহ মো. আতিকুল হক। প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন আনুন নাইম, প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি এবং প্রফেসর ইকবাল আহমেদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন সিলেট সরকারি কলেজ জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা এহসান উদ্দিন। গীতা থেকে পাঠ করেন দেবব্রত চক্রবর্তী, বাইবেল থেকে পাঠ করেন ফিলিপ সমাদ্দার এবং ত্রিপিটক থেকে পাঠ করেন শ্রীমৎ আন্দশ্রী শ্রমণ।

স্বাগত বক্তব্য ও কর্মসূচির উদ্দেশ্য তুলে ধরেন নাজমুল হুদা মিনা, আঞ্চলিক কো-অর্ডিনেটর। এমআইপিএস প্রকল্প সম্পর্কে উপস্থাপন করেন ড. নাজমুন নাহার নূর লুবনা, ডিপিডি, এমআইপিএস। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সিলেট প্যানের জয়েন্ট কো-অর্ডিনেটর নাসরিন জাহান।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পিস অ্যাম্বাসেডর আব্দুস ছাত্তার, ধর্মীয় নেতা মাওলানা ফয়জুন নুর ফয়েজসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপটে ধর্ম, সংহতি ও গণতন্ত্রের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সামাজিক সংহতির দুর্বলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ের ফলে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ যথাযথভাবে চর্চা ও প্রয়োগ করা গেলে তা সামাজিক ঐক্য জোরদার করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ধর্মীয় ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে সহানুভূতি, ভালোবাসা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা, ন্যায়, শান্তি ও সম্মানের মতো নৈতিক মূল্যবোধ লালন করে আসছে। এসব মূল্যবোধ ব্যক্তিগত আচরণ ও সামাজিক নিয়মকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে এবং মানবাধিকার, সমতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের চর্চাকে উৎসাহিত করে। ধর্ম মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে, যা একটি শক্তিশালী ও সংহত সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাগ করা বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও সহায়তা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্প্রদায়ভিত্তিক সংহতি গড়ে তোলে। এই সামাজিক পুঁজি নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। পাশাপাশি প্রার্থনা ও ধ্যানের মতো আধ্যাত্মিক অনুশীলন ব্যক্তির মানসিক স্থিতি বাড়াতে, চাপ কমাতে এবং আশাবাদ ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগ্রত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে, যা সামাজিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে।

তবে বর্তমান বিশ্বে ঐক্য ও গণতন্ত্রের সংকট একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরিচিতিভিত্তিক রাজনীতির কারণে সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়ছে। পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি জনসমর্থনবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে ত্বরান্বিত করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও দুর্বল করছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক-অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে, যা গণতন্ত্র ও সামাজিক সংহতির মধ্যে এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করছে।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক চর্চা, পারস্পরিক সম্মান ও সংহতি জোরদার করা এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান পথ। একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।

শেয়ার করুন