প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী করতে হবে। তিনি বলেন, তিনি বলেন, এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহু মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে, চৌদ্দশো মানুষের রক্তের উপর দিয়ে। এই শহীদদের কাছে সরকারের দায় আছে। ফলে এই সরকার নৈতিকভাবে চাইবে যাতে রাষ্ট্রের সংস্কার ঘটে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
গতকাল শনিবার নগরীর বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স পাঠে ‘গণভোটে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে সিলেট বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর সভাপতিতে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী ও সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, বিগত ষোল বছর এদেশের মানুষ ভোট দিতে পারে নাই শুধুমাত্র এক ব্যক্তি ইচ্ছার কারণে। এক ব্যক্তি একক ইচ্ছায় যখন যা খুশি করেছে, সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছে, মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত অপরাধীদের ক্ষমা করে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। ষোল বছর ধরে এক ব্যক্তি দেশ শাসন করেছে। শুধু শাসন করেছে, তাই না- গুম, খুন, হত্যা, কী হয় নাই এই দেশে!
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির নামে কোনো দন্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার বিধান থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সেটা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী হয়। বিদ্যমান সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী চাইলে আপনার-আমার ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারেন। এর প্রমাণ হচ্ছে এদেশে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অধীনে অন্তত তিনটি সুষ্ঠ-অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল, আপনি-আমি ভোট দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু একজন্য ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় সেটা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করুন একজনের ইচ্ছায় এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। সংসদে কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটিতে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের সদস্যরা ছিল। বিএনপি তখন সংসদে থাকলেও সেই কমিটিতে অংশগ্রহণ করে নাই। সেই কমিটি ১০৪ জন লোকের সাথে কথা বলে ২৫টা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল থাকবে। কিন্তু একটি মিটিং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে করার পর সেই সিদ্ধান্তটা বদল হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। তিনটা নির্বাচনের প্রহসন হয়েছে। এই দেশে আমরা ভোট দিতে পারি নাই।
তিনি সমবেত ইমামদের প্রশ্ন করেন- আপনারা কি এই ব্যবস্থা রাখতে চান? ইমামরা সমস্বরে আওয়াজ দেন- না। তিনি বলেন, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই সংবিধানে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় কোনো অবস্থাতেই যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব না হয়। সেজন্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয় মাস ধরে আলাপ-আলোচনা করে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, এখন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং সেই ব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন- সংসদে ক্ষমতাসীন দল, প্রধান বিরোধী দল, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল মিলে কমিটি করে আলোপ-আলোচনা করে সকলের মতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য একজন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে। যাতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় কোনো অবস্থাতেই আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল না হয়, কিংবা শুধু ক্ষমতাসীন দলে ইচ্ছায় যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রধান নির্ধারণ করা না হয়।
তিনি বলেন, দেশটা যে এক ব্যক্তির হাতে চলে গিয়েছিল, তার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ এই তিনটি নির্বাচন নিয়ে তদন্ত করে দেখা গেছে রাজনৈতিক দলগুলো নাম না দেওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নাম অনুযায়ী রকিব সাহেবকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবস্থাটা বুঝুন, একজন ব্যক্তি ঠিক করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে হবেন, যেই নির্বাচনে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এটাকে উপহাস বললেও ছোট করে বলা হয়।
তিনি প্রশ্ন করেন- আপনারা কি সেই এককেন্দ্রীকরণ রাখতে চান? সমস্বরে ইমামরা আওয়াজ দেন- না। তিনি বলেন, না চাইলে সকলকে আমাদের বুঝাতে হবে যে, এই ব্যবস্থা কত ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। ফলে ষোল বছর ধরে এক ব্যক্তি দেশ শাসন করেছেন। শুধু শাসন করেছেন, তাই না- গুম, খুন, হত্যা, কী হয় নাই এই দেশে! তার দলের একজন নেতা হানিফ হাহেব বলেছেলেন যে, শেখ হাসিনা মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।
তিনি বলেন, গণভোটে হ্যাঁ জিতলে বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকবে, কোনো ব্যক্তি একজীবনে দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। সেটা আমরা যদি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, তাহলে অবশ্যই এই কথাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার নিশ্চয়তা বিধান করতে হ্যাঁ ভোটকে বিজয়ী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নাকি সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর উপর আস্থা থাকবে না! আসলে জুলাই সনদে এরকম কোনো কথা নেই। কেউ যদি এটা বলে, তাকে প্রশ্ন করুন জুলাই সনদের ৩৯ পৃষ্ঠার কোন জায়গায় এটা লেখা আছে?
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার আমিনুল ইসলাম চৌধুরী লিটনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন ও সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মউশিক শিক্ষক ক্বারী মাওলানা শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের চার জেলার ইমামরা অংশ নেন।