এম আতাউর রহমান পীর L
১৯৩২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় সংঘটিত “ইমু যুদ্ধ” মানব ইতিহাসের এক বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেই যুদ্ধে একটি আধুনিক রাষ্ট্র তার নিয়মিত সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করেছিল বন্যপ্রাণী নিয়ন্ত্রণের জন্য। এই যুদ্ধ কোনো প্রতীকী বা সাহিত্যিক রূপক ছিল না; এটি ছিল বাস্তব, সরকারি অনুমোদিত একটি সামরিক অভিযান। প্রতিপক্ষ মানুষ ছিল না, বরং ছিল ইমু নামক অস্ট্রেলিয়ার দেশীয়, বৃহদাকৃতির, উড়তে না-পারা এক পাখি—যাদের সংখ্যা ও আচরণ কৃষকদের কাছে এক ভয়াবহ সমস্যায় পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের নামটি প্রথমে সংবাদমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহৃত হলেও পরে সেটিই ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়, কারণ এই অভিযানের ফলাফল রাষ্ট্রের জন্য গৌরবের বদলে বিব্রতকর শিক্ষা নিয়ে আসে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ান সমাজে যে পুনর্বাসন সংকট তৈরি হয়, ইমু যুদ্ধ তারই একটি পরোক্ষ ফল। যুদ্ধফেরত হাজার হাজার সৈনিককে পুনর্বাসনের জন্য সরকার পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় জমি বরাদ্দ দেয়। এসব জমির অধিকাংশই ছিল শুষ্ক, অনুর্বর এবং কৃষিকাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও জাতীয় দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে সাবেক সৈনিকরা সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। তবে ১৯২৯ সালের মহামন্দা এই ব্যবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্থ করে দেয়। সরকার কৃষকদের গম উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ দেয় এবং ভর্তুকির আশ্বাস দেয়, কিন্তু বাস্তবে সেই সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। বাজারে অতিরিক্ত গম সরবরাহ হয়, দাম পড়ে যায় এবং কৃষকেরা চরম আর্থিক চাপে পড়ে।
এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে প্রকৃতি নতুন আঘাত হানে। প্রায় বিশ হাজার ইমু প্রজনন মৌসুম শেষ হতেই অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে উপকূলের দিকে অভিবাসন শুরু করে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কৃষিজমি, যেখানে পানির কৃত্রিম ব্যবস্থা ও শস্যের প্রাচুর্য রয়েছে, সেই স্থান ইমুদের জন্য আদর্শ পরিবেশে পরিণত হয়। তারা ক্যাম্পিয়ন, চ্যান্ডলার ও ওয়ালগুলান অঞ্চলে দলে দলে প্রবেশ করে। ইমুরা শস্য খেয়ে যেমন ক্ষতি করে; তেমনি তারা জমি পদদলিত করে, ক্ষতের বেড়া ভেঙে ফেলে, ফলে সেই ভাঙা বেড়ার মধ্য দিয়ে খরগোশ ঢুকে ফসলের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়। কৃষকদের চোখে ইমুরা তখন আর বন্যপ্রাণী নয়, বরং জীবিকার বিরুদ্ধে এক বিধ্বংসী শক্তি হিসেবে দেখা দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষকদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ নেয়। সাবেক সৈনিকরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী স্যার জর্জ পিয়ার্সের কাছে আবেদন জানায় এর প্রতিকারের জন্য। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানতেন, মেশিনগান কতটা কার্যকর হতে পারে। তাই তারা সরাসরি সামরিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল দ্রুত ও অস্বাভাবিক—সামরিক বাহিনী পাঠানো হবে, তবে ব্যয়ভার অনেকটাই বহন করতে হবে স্থানীয় সরকার ও কৃষকদের। এই সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, রাষ্ট্র বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখেছিল, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকট হিসেবে নয়।
অক্টোবর ১৯৩২ সালে অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও টানা বৃষ্টিপাতে তা বিলম্বিত হয়। বৃষ্টির ফলে ইমুরা আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে অভিযানের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ২ নভেম্বর অভিযান শুরু হয়। রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান আর্টিলারির মেজর গুইনিড পারভেস উইন-অব্রি মেরেডিথের নেতৃত্বে তিনজন সৈন্য নিয়ে একটি ছোট বাহিনী মাঠে নামে। তাদের হাতে ছিল দুটি লুইস গান এবং প্রায় দশ হাজার রাউন্ড গুলি—যা শুনতে যথেষ্ট শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে তা ইমুদের গতিশীলতার সামনে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
প্রথম দিন থেকেই সেনারা উপলব্ধি করে যে তারা এক অস্বাভাবিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। ইমুরা দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ত, দিক পরিবর্তন করত এবং গুলির আওতার বাইরে চলে যেত। ৪ নভেম্বর এক বাঁধের কাছে এক হাজারের বেশি ইমু একত্রিত হলেও সৈনিকদের বন্দুক জ্যাম হয়ে যাওয়ায় বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়। সেনারা লক্ষ্য করে যে ইমুদের দলে দলে চলার মধ্যে একটি শৃঙ্খলাবোধ রয়েছে। প্রতিটি দলে একটি উঁচু ও শক্তিশালী পাখি পাহারাদারের মতো অবস্থান নেয়, যা বিপদের সংকেত দিয়ে বাকিদের সতর্ক করে দেয়। এই আচরণ সৈন্যদের বিস্মিত করে এবং তাদের যে ধারণা ছিল যে ইমুরা কেবল এলোমেলোভাবে চলাফেরা করে তা ভেঙে দেয়। অভিযান চলাকালে নানা কৌশল নেওয়া হয়। একপর্যায়ে মেশিনগান ট্রাকে বসিয়ে ইমু তাড়া করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু অসমতল জমি ও ইমুদের দ্রুতগতি সেই কৌশলকে ব্যর্থ করে দেয়। কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার রাউন্ড গুলি খরচ হয়ে যায়, অথচ নিহত ইমুর সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। সংবাদপত্রে এই ঘটনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ শুরু হয়। সংসদেও প্রশ্ন ওঠে—একটি আধুনিক সেনাবাহিনী কি সত্যিই পাখির সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে? অবশেষে ৮ নভেম্বর সামরিক অভিযান স্থগিত করা হয়।
তবে এই স্থগিতাদেশ সমস্যার সমাধান আনেনি। খরা ও তীব্র গরমে ইমুরা আবারও কৃষিজমিতে হানা দেয়। কৃষকদের নতুন আবেদনের পর সরকার দ্বিতীয় দফায় সামরিক অভিযান অনুমোদন করে। এবারও মেরেডিথকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়, কারণ স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত মেশিনগান চালকের অভাব ছিল। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত এই দ্বিতীয় অভিযান তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়। মেরেডিথের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রায় ৯,৮৬০ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করে ৯৮৬টি ইমু নিশ্চিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ২,৫০০ আহত ইমু পরে মারা গেছে।
Pdg Ataur
তবুও এই সাফল্য ছিল আংশিক ও সাময়িক। বিশাল ইমু সংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই নগণ্য ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার বুঝতে পারে যে সামরিক পদ্ধতিতে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরবর্তীতে বাউন্টি ব্যবস্থা, শিকারি নিয়োগ এবং উন্নত বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কার্যকর সমাধান খোঁজা হয়। ইমু যুদ্ধ তাই শুধু একটি ব্যর্থ অভিযান নয়, এটি মানুষের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, প্রকৃতি ও পরিবেশকে উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক বিব্রতকর অবস্থায়ও ফেলতে পারে।
ইমু যুদ্ধের ঘটনাটি কেবল একটি ব্যর্থ সামরিক অভিযান হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ারও একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। সে সময়ের সংবাদপত্রগুলো এই ঘটনাকে প্রায় বিদ্রুপের ভাষায় উপস্থাপন করে। “পাখির কাছে সেনাবাহিনীর পরাজয়”—এ ধরনের শিরোনাম জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। সংবাদমাধ্যমের এই চাপই মূলত প্রথম দফার অভিযান দ্রুত বন্ধ করার একটি বড় কারণ হয়ে ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তও জনমত ও মিডিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
এই ঘটনাটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইমু যুদ্ধ দেখায়, রাষ্ট্র যখন সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যাকে নিরাপত্তা সমস্যায় রূপান্তরিত করে, তখন প্রায়ই তার সমাধান ভুল পথে পরিচালিত হয়। কৃষকদের সমস্যা ছিল মূলত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত—খরা, অনুপযুক্ত জমি, ভর্তুকির ব্যর্থতা এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক অভিবাসন। কিন্তু রাষ্ট্র এই জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজেছিল সামরিক শক্তির মাধ্যমে। এর ফলে সমস্যার মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যায় এবং সাময়িক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানের ভ্রান্ত চেষ্টা করা হয়।
পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও ইমু যুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস। ইমুরা কোনো আক্রমণকারী বা বহিরাগত প্রজাতি ছিল না; তারা ছিল অস্ট্রেলিয়ার দেশীয় প্রাণী, যারা মানুষের সম্প্রসারণের ফলে তাদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ হারিয়ে ফেলেছিল। কৃষিজমি সম্প্রসারণ, বেড়া নির্মাণ এবং পানির কৃত্রিম ব্যবস্থা ইমুদের অভিবাসনের স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তন করে দেয়। এই বাস্তবতায় ইমুদের আচরণ ছিল টিকে থাকার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু মানুষ সেই প্রতিক্রিয়াকে শত্রুতামূলক আচরণ হিসেবে দেখেছিল।
ইমু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সূচনা করে। সরকার বুঝতে শুরু করে যে দেশীয় প্রাণীর সঙ্গে সংঘাতে সামরিক সমাধান কার্যকর নয়। এর পরিবর্তে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। বেড়া উন্নত করা, নির্দিষ্ট শিকার নীতি প্রণয়ন এবং ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে বেশি গুরুত্ব পায়। এই পরিবর্তনগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইমু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই উৎসারিত।
এই ঘটনাটি মানবসভ্যতার আত্মঅহংকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আধুনিক মানুষ প্রায়ই প্রযুক্তি ও অস্ত্রের শক্তিতে নিজেকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে মনে করে। ইমু যুদ্ধ সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়। এখানে কোনো সুসংগঠিত প্রতিরোধ ছিল না, কোনো পরিকল্পিত কৌশলও ছিল না—তবুও ইমুরা মানুষের আধুনিক অস্ত্রের সামনে কার্যত অদম্য প্রমাণিত হয়। এটি দেখায় যে প্রকৃতির শক্তি অনেক সময় নীরব, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর।
আজ ইমু যুদ্ধকে প্রায়ই হাস্যরসের সঙ্গে স্মরণ করা হয়, কিন্তু এই হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর ঐতিহাসিক শিক্ষা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ধারণা তখনই টেকসই হয়, যখন তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ১৯৩২ সালের এই ঘটনা তাই কেবল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের একটি কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় নয়; বরং এটি আধুনিক বিশ্বের জন্যও একটি প্রাসঙ্গিক সতর্কবার্তা—যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতে নয়, সহাবস্থানের পথেই টেকসই ভবিষ্যৎ খুঁজে পেতে পারে।
লেখক: সিলেট মদন মোহন কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল