
মাওলানা মুহিউল ইসলাম মাহিম চৌধুরী =
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একটি অপরিহার্য ইবাদত এবং সামাজিক অর্থনৈতিক সাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী মাধ্যম। এটি শুধু ধনীদের সম্পদ পরিশুদ্ধ করে না; বরং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। জাকাতের মাধ্যমে সমাজে নানা ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। ১. দারিদ্র্য দূরীকরণ: জাকাত দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। ধনীদের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রদের মাঝে পৌঁছে যাওয়ার ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পায়। ২. সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা: জাকাত ধনী ও গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে সমাজে ভারসাম্য সৃষ্টি করে। ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। ৩. ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি: জাকাত প্রদানের মাধ্যমে ধনীরা দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় এবং সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। ৪. অপরাধ কমানো: অভাব অনেক সময় মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। জাকাতের মাধ্যমে অভাব দূর হলে চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধও কমে আসে। ৫. সম্পদের পবিত্রতা ও বরকত: জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয় এবং আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। ৬. আত্মিক পরিশুদ্ধি: জাকাত মানুষকে কৃপণতা ও লোভ থেকে মুক্ত করে এবং আত্মাকে উদার ও কল্যাণমুখী করে তোলে। জাকাত প্রদানের আটটি খাত (ব্যাখ্যাসহ) পবিত্র কুরআনে জাকাত ব্যয়ের আটটি খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন (সূরা তাওবা: ৬০): ১. ফকির (الفقير) যাদের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। তারা চরম অভাবগ্রস্ত এবং নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে না। ২. মিসকিন (المسكين) যাদের কিছু আয় আছে, কিন্তু তা তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তারা অভাবগ্রস্ত হলেও ফকিরের তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকে। ৩. আমিল (العاملين عليها) যারা জাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টনের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের পরিশ্রমের বিনিময়ে জাকাতের অর্থ থেকে পারিশ্রমিক দেওয়া যায়। ৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم) যাদের হৃদয় ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা বা ইসলামের প্রতি সদয় করার জন্য সাহায্য করা হয়। নতুন মুসলিমদের সহায়তাও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ৫. দাসমুক্তি (في الرقاب) দাস বা বন্দীদের মুক্ত করার জন্য জাকাত ব্যয় করা। বর্তমান সময়ে অন্যায়ভাবে বন্দী মুসলিমদের মুক্তিতেও এ খাত প্রযোজ্য বলে অনেকে মত দেন। ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين) যারা বৈধ কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম—তাদেরকে জাকাত দেওয়া যায়। ৭. আল্লাহর পথে (في سبيل الله) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে সকল কল্যাণমূলক ও ধর্মীয় কাজ করা হয়—যেমন দ্বীনের প্রচার, জিহাদ বা ইসলামের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ৮. ইবনে সাবিল (ابن السبيل) যে ব্যক্তি সফরে গিয়ে অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই—তাকে জাকাত দেওয়া যায়। #উপসংহার জাকাত ইসলামের একটি মহান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা সমাজে ন্যায়, সহমর্মিতা ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। সঠিকভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টন করা হলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য অনেকাংশে দূর হতে পারে এবং মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। লেখক-কলামিস্ট,ইসলামী চিন্তাবিদ
সম্পাদকঃ আব্দুল বাতিন ফয়সল
সহ-সম্পাদকঃ আব্দুল মুহিত দিদার
মোবাইলঃ ০১৭৩০১২২০৫১
sylhetexpress.net