মুফতি আবুল হাসান (হাফি.): বৃহত্তর সিলেটের প্রাজ্ঞ আলেমে দ্বীন


ক্বারী আব্দুল বাছিত :
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে ইসলামিক স্কলার, বিদগ্ধ ফকিহ, গবেষক, বাগ্মী, সমাজসংস্কারক, দক্ষ সংগঠক এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। বৃহত্তর সিলেটে যে কয়েকজন আলেম নিরলসভাবে ইলমে দ্বীনের খেদমত করে যাচ্ছেন মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মসজিদের মিম্বর থেকে হাদিসের মসনদ; এমনকি ওয়াজের ময়দানেও তিনি সমানভাবে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যেমন সমাজের এলিট ব্যক্তিত্বের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন, তেমনই সাধারণ তৌহিদা জনতাও তাঁর বয়ানের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা; সর্বোপরি উপস্থাপনের অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে অন্যান্য ইসলামী আলোচকের থেকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ইসলামের প্রতিটি শাখায় তাঁর বিচরণ সকলের কাছে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শিক্ষা, ওয়াজ-নসিহত, সুন্নতের অনুসরণ, সুন্দর আচরণ ও বিনয়ী মনোভাবের কারণে তিনি সর্বস্থরের মানুষের নিকট ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) ১৫ অক্টোবর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ২নং বীরশ্রী ইউনিয়নের মাঝরগ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম কাজী আব্দুল লতিফ ছিলেন পরোপকারী ও পরহেজগার ব্যক্তিত্ব। তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে ‘কাজী সাহেব’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাতা মোছাম্মৎ আছারুন বিবি গৃহিণী। তিনিও একজন নেককার এবং মহীয়সী নারী। ধার্মিক পিতা-মাতার সংস্পর্শ মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)-কে ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি জীবনবোধ চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহিত এবং ১ কন্যা সন্তানের জনক।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত তীক্ষè এবং প্রখর। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। এরপর তিনি পশ্চিম জামডহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর শেরুলবাগ আনোয়ারুল উলুম মোহাম্মদীয়া মাদরাসায় হিফজুল কুরআন বিভাগে কিছুদিন পড়াশোনার পর জামেয়া দারুসসুন্নাহ বড়পাথর মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে হিফজ সম্পন্ন করেন। হিফজ সমাপনের পর তিনি ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে হিফজুল কুরআন পরীক্ষায় আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সমগ্র দেশের মধ্যে ৩য় স্থান অর্জনের মাধ্যমে পুনরায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বোর্ডের অধীনে প্রথম বিভাগে ছাফেলা চাহারম (এসএসসি সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম (বৃহত্তর সিলেট) বোর্ডের অধীনে প্রথম বিভাগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে মুতাওয়াসসিতাহ (এইচএসসি সমমান), ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভাগে ফজিলত (ডিগ্রি সমমান) এবং ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেন। মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)-এর ছিল অদম্য ইলম পিপাসা। তিনি ইলমে দ্বীনের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা অজর্নের জন্য ১৯৯২-১৯৯৩ সালে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণা বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই অর্জন তাঁকে পরবর্তী জীবনে ইসলামী গবেষণা ও মাদরাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা প্রদান করে।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) কর্মজীবনে শিক্ষকতা তথা ইলমে দ্বীনের খেদমতকেই তাঁর জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হিসেবে বেছে নেন। ইলমে দ্বীনের খেদমতের মহান লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইসলামিয়া দারুসসুন্নাহ মোহাম্মদীয়া লামারগ্রাম মাদরাসায় মুফতি ও মুহাদ্দিস পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে ইফতা (ইসলামী গবেষণা) বিভাগের প্রধান ও শায়খুল হাদিস পদে পদোন্নতি পান এবং অদ্যাবধি এই পদে থেকে ইলমে দ্বীনের খেদমত করে যাচ্ছেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি ২০০০ খ্রিস্টাব্দে জকিগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব নিযুক্ত হন। ২০১৩ সাল থেকে পার্শ্ববর্তী বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কেন্দ্রীয় মোকাম মসজিদের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ১ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) ইলমে শরিয়াহ অর্জনের পাশাপাশি ইলমে তাসাওউফ অর্জনের প্রতিও মনোনিবেশ করেন। এজন্য তিনি ভারতের আসাম রাজ্যের প্রথিতযশা আলেমে দ্বীন, শায়খুত তরিকত, সুলতানুল আরেফিন খলিফায়ে মাদানী হজরত ইয়াকুব শাহ বদরপুরী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা, উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় আমিরে শরিয়ত আল্লামা তৈয়বুর রহমান বড়ভূঁইয়া (রহ.)-এর নিকট পবিত্র সালাতুল ঈশার সময় বাইয়াত গ্রহণ করেন। দূরদর্শী বড়ভূঁইয়া (রহ.) মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)-এর যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে ঠিক পরের দিন বাদ ফজর অর্থাৎ ২০১৩ সালে তাঁকে চার তরিকার ইজাজতও খেলাফত প্রদান করেন। হজরতের জীবদ্দশায় তিনি একাধিকবার বদরপুর টাইটেল মাদরাসার ঐতিহাসিক খতমে বুখারি মাহফিলে বিশেষ অতিথি হিসেবে হিসেবে ভারত সফর করেন। এসময় তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের অসংখ্য মাহফিলে বয়ান রাখেন। এছাড়া পরবর্তীতে তিনি হজরত হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা হজরত আব্দুল বারী কাপাসিয়ার পীর সাহেব (রহ.)-এর নিকট থেকেও ইলমে তাসাওউফের ইজাজতপ্রাপ্ত হন। তিনি আল্লামা আব্দুল জব্বার রায়পুরী (রহ.)-এর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এবং বিশেষ দোয়া প্রাপ্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি হজরত শায়খে চৌঘরী (রহ.), খলিফায়ে মাদানী আল্লামা আবদুল গাফফার মামরখানী (রহ.) প্রমুখ বুজর্গানে দ্বীনের সাহচর্য লাভ করেছেন। তিনি প্রত্যেক রামাদ্বান মাসে ইতিকাফ করে জকিগঞ্জের অসংখ্য যুবক-তরুণের মাঝে আধাত্মিক সাধনার প্রেরণা যোগান। মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একজন দুনিয়াবিমুখ আলেমে দ্বীন। তিনি দ্বীনের একজন মুখলিস দাঈ। এজন্য খেলাফতপ্রাপ্ত হলেও তিনি কাউকে বাইয়াত করেননি। ইলমে তাসাওউফে তিনি নিজেকে সবসময় লুকিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) খেলাফত প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। এজন্য তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন ‘খেলাফত মজলিস’-এর মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আদর্শ এবং মূলনীতির সাথে একাত্ম হয়ে দ্বীনি দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা শাখার উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কাজকে ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখছেন। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা ও আমেলার সদস্য এবং সিলেট জেলা কমিটির সেক্রেটারি, নদওয়াতুল আজকারের ফাতওয়া বিভাগের প্রধান, জাতীয় ইমাম সমিতি, সিলেট জেলা শাখার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় ইমাম সমিতি জকিগঞ্জ পৌর শাখার সভাপতি এবং জকিগঞ্জ কওমী মাদরাসা ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একটি আলোকিত, মানবিক ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তিনি ২০০৭ সাল থেকে জকিগঞ্জ উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটি, চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটি, গুজব প্রতিরোধ কমিটি এবং উপজেলা সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি জকিগঞ্জ, সিলেট-এর সদস্য হিসেবে নিয়মিত সভায় উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করছেন। এছাড়া রাইজিংসান বহুমুখী সমবায় সমিতির শরিয়াহ বোর্ডের প্রধান এবং জকিগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সুচিন্তিত এবং প্রাজ্ঞ পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা একটি আলোকিত সমাজ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে তিনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগত্য ও আস্থা অর্জন করেছেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শায়খুল হাদিস আল্লামা উবায়দুল হক উজিরপুরী (রহ.)-এর সার্থক ও যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি তাঁর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কেও বাঁধা। এজন্য তিনি ছাত্রজীবন থেকেই জকিগঞ্জের মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) সাবেক এমপি আল্লামা উবায়দুল হক উজিরপুরী (রহ.)-এর নির্বাচনী সময়ে এবং পরবর্তী পাঁচ বছর যাবত সকল উন্নয়ন কর্মকা-ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন। বলতে গেলে, এই সময়গুলোতে মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) আল্লামা উবায়দুল হক উজিরপুরী (রহ.)-এর সাথে ছায়ার মতো ছিলেন। তিনি ছিলেন উজিরপুরী (রহ.)-এর বিশেষ স্নেহধন্য এবং সরাসরি ছাত্র। এছাড়া দেশের সেরা ইসলামিক স্কলার এবং বুজুর্গদের সাহচর্য লাভ করেছেন মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)। যা তাঁর চিন্তাচেতনা, মনন এবং ব্যক্তিচরিত্রকে সমহিমায় উদ্ভাসিত করেছে। এর কারণে তিনি যোগাযোগ, শিক্ষা, সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই সমাজ ও জাতির জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ খাদিম। শিক্ষা, সমাজসেবা এবং ইলমে দ্বীনের খেদমতের মূল্যায়নপূর্বক তিনি ‘রাগিব-রাবেয়া ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেছেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন পরামর্শক হিসেবেও বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য একটাই। সেটা হচ্ছেÑদ্বীনি দাওয়াতের কাজকে ছড়িয়ে দেওয়া। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি নিজেকে বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছেন। কখনো উপদেষ্টা, কখনো পরামর্শক, কখনো পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। ২০১৮ সালে জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় জামিয়া শাইখ উবায়দুল হক (রহ.) মাদরাসা। এ মাদরাসার নামকরণ করা হয় প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ, পীরে কামিল, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য, শায়খুল হাদিস আল্লামা উবায়দুল হক উজিরপুরী (রহ.) এর নামানুসারে। বলতে গেলে, এটি হচ্ছে উজিরপুরী (রহ.)-এর দোয়ার ফসল। মাদরাসাটি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মাদরাসা থেকে অসংখ্য হাফিজে কুরআন এবং তালিবে ইলম তৈরি হচ্ছেন। মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) শুরু থেকেই এ মাদরাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মুরব্বি হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, দোয়া এবং সার্বিক সহযোগিতায় মাদরাসাটি অত্র এলাকার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একজন যুক্তিবাদী সুবক্তা হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক বিষয় ও জীবন-জিজ্ঞাসা নিয়ে তার আলোচনা দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাঁর আলোচনা শোনার জন্য ওয়াজ মাহফিলে দূর-দূরান্ত থেকে তৌহিদি জনতার ঢল নামে। তাঁর সহজ-সরল, প্রাঞ্জল এবং প্রাজ্ঞ উপস্থাপনা সকল শ্রেণির মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। বয়ানের মাঝে মাঝে তাঁর হাস্যরস উপস্থাপনা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি যুক্তির আশ্রয়ে গল্পের উপস্থাপনা করেন। কিন্তু সেই গল্পে থাকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়। যা শ্রোতা এবং দর্শকদের জন্য অনেক উপকারী। তিনি বয়ানের নামে কখনো মনগড়া কিচ্ছা-কাহিনী উপস্থাপন করেন না। বরং তাঁর আলোচনার পুরোটা সময় জুড়ে থাকে কুরআন-হাদিসের সারনির্যাস। দর্শক এবং শ্রোতাদেরকে বয়ানের দিকে আকর্ষিত করে রাখার জন্য তিনি বেশ পারদর্শী। এছাড়া দালিলিক উপস্থাপনা বিদগ্ধ সমাজেও নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। তিনি দ্বীনের কাজে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সফর করেন নিরলস এবং ক্লান্তিহীনভাবে। তিনি একজন ইসলামী বক্তা হিসেবে ভারত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম এবং সিরাত মাহফিলে তিনি কুরআন-হাদিসের ওপর আলোচনা করে থাকেন। তিনি একজন লেখক, গবেষক এবং ইসলামী চিন্তাবিদ। তাঁর অনেক গবেষণাধর্মী লেখা স্থানীয় দৈনিক, মাসিক, ম্যাগাজিন ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখাগুলোতেও মিশে আছে সুচিন্তিত পরামর্শ এবং প্রাজ্ঞতার সুস্পষ্ট ছাপ।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একজন বিচক্ষণ এবং প্রাজ্ঞ ফকিহ। তিনি অনেক সামাজিক সমস্যার কুরআনিক সমাধান দিয়ে থাকেন। তাঁর কাছে দলমত নির্বিশেষে সবাই নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত দায় ও দরদের সাথে তাদেরকে সমাধান দেন। বিশেষ করে ইলমে ফারাইজ ও তালাকের মতো ঘটনাগুলো তাঁর কাছে বেশি উত্থাপিত হয়। এক্ষেত্রে তিনি একজন বিজ্ঞ ফকিহ হিসেবে সহজ-সরল সমাধান পেশ করে থাকেন। যা তাঁর সম্মান-মর্যাদাকে সকলের কাছে অত্যন্ত উচ্চকিত করেছে। এছাড়া একজন সালিশ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর রয়েছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মানুষ তাঁর কাছে আসেন। তিনি তাঁদেরকে অত্যন্ত দরদের সাথে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। একজন সুবিচারক এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামাজিক সমস্যাবলী সমাধানে তাঁর ভূমিকা সবার কাছে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করছে।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একজন উম্মাহপ্রেমী আলেমে দ্বীন। তাঁর আলোচনাজুড়ে থাকে উম্মাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও প্রেম। তিনি কখনো কাউকে আঘাত করে কথা বলেন না। তবে ন্যায়-নীতির প্রশ্নে তিনি কখনো ছাড় দেন না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আকিদার প্রশ্নে তিনি সবসময় আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিগত সময়ে যখনই ইসলামের ওপর আঘাত এসেছে, তিনি নিজস্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছেন। সমাজের মানুষকে ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ট ভূমিকা রাখতে তিনি সকল সময় উজ্জীবিত করছেন। তিনি একজন মধ্যমপন্থী বিচক্ষণ আলেমে দ্বীন। যিনি সকল ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ এবং কলুষতামুক্ত ব্যক্তিত্ব। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেন। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাইÑএটাই তাঁর জীবনদর্শন। এ দর্শনকে ধারণ করে তিনি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রেখেছেন। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে উম্মাহর চেতনাকে ধারণ করে তিনি মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করে আসছেন।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) একজন খাঁটি আশিকে রাসুল। তাঁর ব্যক্তিচরিত্রে রাসুল (সা.)-এর আদর্শের ছাপ পরিস্ফুটিত। তাঁর আচরণে পাওয়া যায় নম্র, ভদ্র, বিনয়, অমায়িকতা, সহনশীলতা, ধৈর্য, পরমতসহিষ্ণুতা, ন্যায়পরাণয়তা, মানবিকতা; সর্বোপরি আখলাকে হাসানার প্রত্যেকটি গুণ তাঁর মধ্যে বিরাজমান। যা তাঁকে আলেমসমাজের মধ্যে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছে। পোশাক-পরিচ্ছদ, হাঁটাচলায় তিনি রাসুল (সা.)-এর আদর্শকে অনুসরণ করেন আন্তরিকভাবে। তিনি যখন কথা বলেন, তখন রাসুল (সা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং বিনয় উদ্ভাসিত হয়। তাঁর সাদামাটা জীবন প্রমাণ করে যে, তিনি একজন সত্যিকার ইলমে নববীর ওয়ারিস। যিনি তাঁর ব্যক্তিজীবন থেকে সামগ্রিক জীবন কুরআন-হাদিসের আলোকে পরিচালিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকেন। একজন মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজের সকলের কাছে তিনি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার পাত্র।
মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) বৃহত্তর সিলেটের একজন প্রাজ্ঞ আলেমে দ্বীন। যিনি তাঁর পুরো জীবনকে ইসলামের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, অমায়িক এবং আন্তরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি সকলের কাছে মর্যাদার আসন অলঙ্কিত করেছেন। দুনিয়ার প্রতি লোভ-লালসাহীন মুফতি আবুল হাসান (হাফি.) তাঁর নিজ কর্মগুণে সদা পরিস্ফুটিত হচ্ছেন দিনে দিনে। সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় নাম। ‘জকিগঞ্জি মুফতি’ বললে যাকে সবাই একনামে চিনে, তিনিই হচ্ছেন মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা; সর্বোপরি আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম প্রেম ও ভালোবাসা বৃহত্তর সিলেটের মানুষের মাঝে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নিরন্তর। ইলমে দ্বীনের এমন রাহবার পুরো সিলেটবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের ধন। একজন খালিস-মুখলিস দাঈ হিসেবে তিনি ছুটে চলেছেন অবিরাম। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি যে জৈবনিক প্রবাহ নিয়ে কাজ করছেন, তাতে তিনি তৌহিদপ্রিয় মানুষের মাঝে ভালোবাসার আধার হয়ে থাকবেন। তিনি আমাদের মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। আল্লাহ তাঁকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করেন। আমি মুফতি আবুল হাসান (হাফি.)-এর নেক হায়াত এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।
লেখক: গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন